গল্প

আজ মাধুরির বিয়ে...

           ... মৃণ্ময় 


এটা চৌধুরী সাহেবের বাড়ি না?
আমি কোনো এক ভদ্র লোককে জিগ্যেস করলাম
ভদ্রলোক বললো হ্যাঁ,  এটাই চৌধুরীর বাড়ি। চৌধুরী বলতে খালেক চৌধুরী। তিনি আমার দূর সম্পর্কের মামা হন। মায়ের খালাতো ভাই। 
আজ চৌধুরী সাহেবের মেয়ে মাধুরীর গায়ে হলুদ রাত্রি। রাস্তার পাশেই ওনার বাড়ি। পুরো বাড়িজুড়ে জোনাকি বাতির সাঁঝে জমকালো অনুষ্ঠান হচ্ছে।  সম্ভবত আমি আসতে দেরি করলাম। আস্সালামুয়ালাইকুম মামা ; সালাম দিয়ে পুরো বাড়িটা একনজরে দেখলাম। আমার পড়নে একটা হলুদ পাঞ্জাবী আর সাদা পায়জামা। অবশ্য আগে হলুদ পাঞ্জাবী তো দূরের কথা কোনো পাঞ্জাবী-ই পরতাম না আমি। সম্প্রতি একসময়ের তুমুল  জনপ্রিয়  কথাশিল্পি হুমায়ুন আহমদ-এর হিমু সিরিজ পড়ে আমার মাথাটা গেলো। 
নাহ, হিমুর মত আমার মাথা ঘোলাটে কিংবা উদ্ভট না। তবে আমি মাঝে মধ্যে হিমুরূপী হয়ে সবাইকে হকচকিয়ে দিতে পছন্দ করি। 
হিমু রাতের বেলা খালি পায়ে হাঁটতে পছন্দ করে। আমিও রাতের বেলা হাঁটতে পছন্দ করলেও খালি পায়ে না। কারণ, খালি পায়ে হাঁটা যে বড়ই অসহনীয় তা আমি গত দুইদিনেই বুঝলাম।


আমি প্রায় দুই ঘন্টা যাবৎ বসে আছি সোফায়। পুরো ঘরে বিরিয়ানির ব্যাপন  এ আমার পেট পুরে গেছে। আমাকে বিরিয়ানীর থালা দেওয়া হলো। এতগুলি বিরিয়ানী আমার খাওয়া সম্ভব হলো না। এদিকে মাধুরির স্টেজ সাজানো নো বাকি রয়ে গেলো। ওয়েডিং প্ল্যানাররা এই কাজটা একটু গভীর রাতে করতে পছন্দ করে। কারণটা বোধ হয় এই হবে প্রকৃতি সাজে তাঁর আপন ইচ্ছায়। গায়ে হলুদের কাজ রাত করে না করলে সৌন্দর্যের কিছু একটা বাকি রয়ে যায় যায় ভাব। 

আমার চোখজোড়া ঘুমে ভার হয়ে আসছে। কি করা যায় ভাবতে ভাবতে ছাদে চলে গেলাম। সেখানেই মাদুর পেতে শুইলাম। আকাশে আজ উজ্জ্বল তারারা খিকখিক করে আসছে। সম্ভবত তারাও মাধুরির বিয়ের আনন্দের ভাগ পেতে চায়। মানুষের আনন্দ থাকতে পারে, প্রকৃতির কি থাকতে পারে না? আচ্ছাহ,  প্রকৃতির ও কি বিয়ে করার শখ জাগে? আজকের চাঁদটা সবচেয়ে বড় দেখা যাচ্ছে।  চাঁদ সম্ভবত আজই পৃথিবীতে নেমে আসবে বিয়ের আনন্দ নেওয়ার জন্যে। আমি মাথার নিচে দুহাত রেখে, পায়ের উপর পা দিয়ে এসব ই ভাবতেছি। কখন যে চোখ লেগে এলো খেয়াল করিনি।

যখন আমার ঘুম ভাঙে তখন রাত ১২ টা কি সোয়া ১২ টা হবে। গভীর ঘুম আপনা আপনি ভাঙে না। আমার মনে হলে বৃষ্টির পানিতে আমার ঘুম ভাঙলো। কিন্তু এই বৃষ্টির পানি যে কোনো এক রমনীর হাতের স্পর্শমাখা পানি সেটা একটু পরই টের পেলাম।  ছাদে কিছু বাচ্চা হাসাহাসি করছে। একি! রূপাও যে হাসছে ওদের সাথে। বুঝতে পারলাম আমাকে রূপা-ই ঘুম থেকে জাগালো। রূপার অদ্ভূতুরে হাসির দিকে তাকিয়ে আছি।  অন্য দিকে আর খেয়াল নেই। রুপা হলো মাধুরীর ছোট বোন।আমাকে খুব ভালো করেই চিনে ও। ওর স্কুল  আমাদের কলেজের পাশেই ছিল। মাঝে মাঝে দেখা হলেও কথা হতো না। 

নিচে নেমে দেখি দামি দামি ফুল দিয়ে স্টেজসহ পুরে ঘর, সিঁড়ি সাজানো।  চৌধুরী সাহেবা অর্থাৎ আমার দূর সম্পর্কের মামি তার পরিচিত কয়েকজনের সাথে উল্লাস মুখে কথা বলছে। মাধুরীর চোখ ছলছল করছে। চোখে মুখে সুখের হাসি এটা বুঝাই যাচ্ছে। ওর সাথে বসে আছে ওর চিরচেনা বান্ধবী রা। আর মাত্র এই রাতটাই তো এরপরে কি আর সেই সুযোগ হবে কথা বলার মতো? 

বিয়ে টা হচ্ছে রমজান মাসে। ১৬ ই রমজান  চলছে। রমজান মাসের বিয়ের কোনো মানেই হয় না। মামা-মামি-কে  এই ব্যাপারে জিগ্যেস করতে যাব, এমব সময়ে খুব জোরালো একটা ধাক্কা খেলাম। 



এইইই যে মিস্টার মৃন্ময় চৌধুরী! একটু খেয়াল করে হাঁটতে পারেন না বুঝি? আমি তার পড়ে যাওয়া ফুলগুলো তুলতে তুলতে সরি বললাম রূপাকে। সিঁড়ি দিয়ে উঠার সময় ফোনটা বেঁজে উঠলো আমার। ফোনের দিকে তাকাতে তাকাতেই এমন অবস্থা হলো আমার। আম্মু কল দিয়েছে পৌঁছে ওনাকে কল দিলাম না কেনো তা জানতে। মনে মনে অনেক রাগ হলো। এই সময়ে কল না দিলে এমন অবস্থা হতো না আমার। একবার পিছনে তাকালাম, দেখলাম রুপাও পিছনে তাকিয়ে মুচকি হাসি দিয়ে চলে গেল তার বোনের কাছে।

জানতে পারলাম, রমজান মাসে বিয়ের কারণটা।  মাধুরীর হবু জামাই থাকে অ্যামেরিকায়। সংসারে সে আর তার একমাত্র বোন এবং মা। সাহেদের বোনের বিয়ে হলো  মাসখানেক আগে। এদিকে তার আম্মু অসুস্থ। 
সেজন্যেই রমজান মাসে বিয়েটা হচ্ছে।  শুধু তা না, বিয়ে টা হচ্ছে মোবাইলে। একথা শুনার পর মামা মামির প্রতি প্রচন্ড রাগ হলো। আর যাই হোক মোবাইলে বিয়েটা মেনে নেওয়া যায় না। 

ঘুম থেকে উঠে দেখি সূর্যের কড়া রৌদ্র। প্রায়  সাড়ে ১১ টা বাজে। সারারাত ঘুমাইনি সেহেরি খেয়ে নামাজ পড়ে ঘুমালাম। গোসল করবো। কিন্তু বাথরুমে পানি নেই। আজকের দিনটায় সম্ভবত পুকুরেই গোসল করতে হবে। মামাদের বাড়ির কাছেই ছিল পুকুর। সেখানে অনেজ দিন পর সাঁতরিয়ে গোসল করলাম। ছোট কালপর সাঁতরানোর স্মৃতি মনে পড়লো। কত আমেজই না ছিল দিনগুলো।

সন্ধ্যার আগ মূহুর্তে বরযাত্রীরা আসলো। বর তো নেই। কিন্তু বরের আত্মীয় স্বজন আর বোন এবং মা। ইফতারের আগ মুহূর্তে শুভকাজটা শেষ করতে পারলে ভালো হয়। কাজী ইমাম আসলো। সেখানে শুরু হলো এক কান্ড। ইমাম সাহেব বললেন, বরকে মোবাইলে কবুল বলা ছাড়াও বরের পক্ষ থেকে আরেকজন কবুল বলতে হবে।

আরেকজন? না,  এটা কিভাবে সম্ভব? এটা কখনো হয় না। আমরা আর কখনো এরকম দেখিনি। বরপক্ষের কেউ একজন বলে উঠলো।
হইচই শুরু হলে, ইমাম সাহেব বললেন এটাই সঠিক নিয়ম। তোমরা পারলে অন্য কোনো মুফতী কে জিগ্যেস করতে পারে। সেখানে উপস্থিত থাকা বরপক্ষের আরেকজন বলে উঠলো আমিও তো মোবাইলে বিয়ে করেছি। এমন করতে হয় নি।  তবে আবার দেশে এসে বিয়ে করতে হলো। এবার ইমাম সাহপব বললেন ওনার ওই পন্থা অবলম্বন করলে আর দ্বিতীয়বার দেশে এসে বিয়ে করতে হবে না। 

এবার সবাই ব্যাপারটা মেনে নেন। বিয়ের সব আয়োজন করা হলো। এবার ঘটলো মহাবিপদ!
ছেলের কোনো খোঁজ পাওয়া যাচ্ছে না। মোবাইল সুইচড অফ! সবাই এখন চিন্তায় পড়ে গেলো? বরের চাচাতো ভাই বললো সে পাঁচ মিনিট আগে কথা  বলেছে কিন্তু এখন সুইচড অফ কেনো সে বুঝতে পারছে না।মাধুরির চোখের কোণায় পানি, খুব করে কাঁদতে ইচ্ছে করা সত্যেও পারছে না। নিজের উপর নিজের অভিমান হচ্ছে খুব। নিজেকে অলক্ষুনে ভাবা শুরু করলো কনেপক্ষ খুব দুশ্চিন্তাগ্রস্ত। তবে কি মেয়ে পছন্দ হয়নি? নাকি অন্য কিছু?

মন্তব্যসমূহ

Rana বলেছেন…
Ore vai... osthir protiva

এই ব্লগটি থেকে জনপ্রিয় পোস্টগুলি

গল্প

গল্প