গল্প
গল্প
অবন্তিকার ভালোবাসা...
মৃন্ময় মনির
আইসোলেশনে আছি দুইদিন হলো।। গত শুক্রবার থেকেই সর্দি,গলাব্যাথা, জ্বরসহ বিভিন্ন উপসর্গ দেখা দিল আমার...
রক্তের দরকার। রক্তের গ্রুপ ও-(O-Negative)। খুবই রেয়ার রক্ত। এই এন্টিবডি ফেলে হয়তো আমি মৃত্যুমুখ থেকে উঠে দাড়াতে পারি।
আমার কাজিন শুভ ফেইসবুকে স্ট্যাটাস দিল রক্তের জন্য।
হঠাৎ খবর পেলাম রক্তের ব্যবস্থা হলো...
কোনো এক কলেজ পড়ুয়া মেয়ে আমায় রক্ত দিচ্ছে।ওর রক্ত ও-নেগেটিভ। সে দেখতে কেমন আমি ঠিক জানিনা। আমার সাথে দেখা হয়নি। কিন্তু তার জন্যেই আমি সুস্থ হয়ে বাড়ি ফিরে আসতে পেরেছি।
হাসপাতালের দেওয়া ফাইল থেকে মেয়েটার নাম্বার পেলাম। কল দিলাম...
আমিঃহ্যালো!! হ্যালো!! হ্যা!!
ওপাশ থেকে কোনো কথাই আসছে না।
আমিঃ হ্যালো আপনি কি অবন্তিকা?
কথা বলছে না, তবে মনে হলো নিস্তব্ধে দীর্ঘশ্বাস ফেলছে।
আবার ও কল দিলাম, আপনি অবন্তিকা কিনা সেটা বলুন, আর না হলে ওর কাছে ফোনটা দিন।
রিপ্লাই আসলোঃ এখানে অবন্তিকা নামের কেউ থাকেনা। কোনো এক ভামাস্বর ছিল এটা।
সাথে সাথে শুভকে গিয়ে বললাম, কিরে কিছুই বুঝিনা। মেয়েটার নাম নাম্বার কোথাও ভুল আছে কিনা দেখতে একটু।
--নাহ, কিছুই ভুল নেই। তবে কেনো তোর ওকে কল দিতেই হবে?
:আররেহ, ভাই। একটা মেয়ে আমাকে রক্ত দিয়ে জীবন বাঁচাল তাও এই CoVid-19 এর অসময়ে। তুই একবার ভাবছিস ও রক্ত না দিলে আমার কি হতো?
--হুম,তা অবশ্য ঠিক।
:হুম, ওকে একটা ধন্যবাদ দিব এটাই ইচ্ছে।
কিন্তু তুই মেয়েটার কোনো ঠিকানা জানিস?
না
ওহ, এই ফাইলেও তো কোনো ঠিকানা দিলোনা।
যাই হোক আমি অবশেষে মেয়েটার খোঁজ পেলাম। সিম কোম্পানী থেকে ওর ঠিকানা নিলাম....
অবন্তিকার বাসায় গিয়ে আমি অশ্রুসিক্ত নয়নে ফিরে আসতে হলো।
আমার চোখ টকটকে লাল হয়ে গেল, মুখেের মাস্ক বেয়ে পানি গড়াতে লাগলো। আমি হাত দিয়ে চোখের পানি মুছবো এমন ই সময় পিছন থেকে ডাক দিল...
শুভঙ্কর!!!
দাড়ালাম।
---আই এম সরি শুভঙ্কর!!
ওইদিনের ভুল আমি বুঝতে পেরেছি। আসলেই ওইদিন আমার খুব অন্যায় হয়েছে। তোমার সাথে এমন ব্যবহার করা আমার উচিত হয়নি। আমি ক্ষমাপ্রার্থী।
গত ১ মাস আগেও আমি কোভিড-১৯ আক্রান্ত ছিলাম। তখন যে কি যন্ত্রণা হলো মনে হলো আমি মরেই যাচ্ছি। কোনো এক ব্লাড গ্রুপ সংগঠনের স্বেচ্ছাসেবকরা আমাকে রক্ত দিয়ে জীবন বাঁচালো। তখনই মনে হলো আমি যে অহংকারময় সমাজে আছি এটা নিতান্তই আমার ভ্রান্ত সমাজ। তোমার সাথে আমি খুব অন্যায় করেছি, আমাকে মাফ করে দাও এসব বলে অবন্তিকা কেঁদে দিলো। আর আমি নিস্তব্ধ হয়ে, নিচের দিকে তাকিয়ে আছি।
(অবন্তিকার সাথে আমার পরিচয় হলো ৫ বছর আগে। তখন আমি ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে ১ম বর্ষের ছাত্র। ১ম দিনের ক্লাসে একটু দেরিতে যাওয়ায় খুব তাড়াহুড়া ছুড়লাম ক্লাসের দিকে। হঠাৎ করেই মেয়েটির সাথে আমার ধাক্কা খায় তখন আমি ৪৪০ ভোল্টের ইলেক্ট্রিক শক্ খেলাম। খুব রূপসী মেয়েটা। ওর রূপ যেকোনো ছেলেকেই পাগল করবে, আমিও পাগল হয়েছিলাম। কিন্তু ও আমার ভালোবাসার গুরত্ব দেয়নি। ওকে নিয়ে অনেক স্বপ্ন ও গল্প, কবিতা তৈরী করতে লাগলাম। সেবছরেরই আমি ছোট্ট একটা গোলাপ নিয়ে, খুব গোছালো হয়ে ওর কাছে গেলাম। আমি আমার ভালেবাসার কথা বললাম। কিন্তু ও আমাকে সবার সামনে অপমানিত ও লাঞ্চিত করলো..
তারপরও বললাম, রূপা আমি তোমাকে সত্যিই খুব ভালোবেসে ফেলেছি(রূপা ওর আসল নাম, হাসপাতালের ফাইলে ছদ্মনাম ব্যবহার করেছে সম্ভবত আমাকে সে চিন্তে পেরেই এটা করেছে।)
অবন্তিকা আমাকে আবারো বলতে লাগলো;এই মহামারীতে কত প্রিয় মানুষদেরকে হারিয়েছি আমি। তখন মনে হলো, টাকা পয়সা,ধন-সম্পদ এগুলো ঠুমকো বাদামের খোসা ছাড়া আর কিছুই নয়। টাকা দিয়েও আমাদের বাড়ির রহিম চাচাকে বাঁচানো গেলোনা। বিশ্বাস কর শুভঙ্কর আমি আগের থেকে অনেক পরিবর্তন হয়ে গেছি। এর মধ্যে জীবনে মনের মত কোনো সঙ্গীও পেলামনা।
আমি জানি তুমি আমার উপর রাগ করে আছো...
আমি যে কতটা স্বার্থপর ছিলাম সেটা আমি এখন বুঝি। মানবিকতা বলতে কিছুই ছিলনা আমার। আচ্ছাহ, আমি যদি তোমাকে আমার কাছে টেনে নিই তবে কি তুমি আসতে চাইবে?
:শুধুমাত্র ধন্যবাদ দেওয়ার জন্যে এখানে এসেছি। তবে এটা সত্যি যে তোমার দেওয়া এন্টিবডির জন্যেই আমি এখন এখানে দাড়িয়ে আছি।
মানুষের জীবন সবসময়ে গতিশীল থাকে, কারে জন্যে জীবন থেমে থাকেনা...
এই বলে আমি চলে আসলাম...
অবন্তিকা কাঁদছে...
তার এই কান্না হয়তোবা ভালোবাসার কান্না। নিজের ভুল বুঝতে পারার সমুদ্রঢেউ...
কাউকে পাওয়ার আকাঙ্ক্ষা......
জানিনা তাঁকে ক্ষমা করবো কিনা...
গল্পের বাকিটা পাঠকের হাতেই হস্তক্ষেপ করে দিলাম।
বাকিটা পাঠক মিলিয়ে নিবেন।
........মৃন্ময়........
মন্তব্যসমূহ